ব্রোকেন ফ্যামিলি

ধর্ষিত হলে সে অপরাধী, খুন হলে সে অপরাধী, আর যদি সেটা কোনো মেয়ে হয় তো কথাই নেই...

0
ব্রোকেন ফ্যামিলি the policy times

ভিক্টিম ব্লেমিং বিষয়ের চর্চা বহুকাল ধরেই হয়ে আসছে। যেমন ধর্ষিত হলে সে অপরাধী, খুন হলে সে অপরাধী, আর যদি সেটা কোনো মেয়ে হয় তো কথাই নেই! এরপর স্বামী নির্যাতন করলেও স্ত্রী অপরাধী কারণ স্বামীকে বশ করতে পারে না! আর ডিভোর্স হলে মানে কারও কারও ভাষায় সংসার ভাঙলে বউ অপরাধী, মানিয়ে নিতে পারেনি, আর একটু সহ্য করলে কী হতো, স্বভাব খারাপ ব্লা, ব্লা, ব্লা.. সেখানে স্বামী বা স্ত্রীর চরিত্র যাই হোক, ব্যক্তিত্বের সংঘাত কিংবা অভ্যন্তরীণ নানা কারণ না জেনেই বিশ্লেষণ শুরু হয়ে যায় স্ত্রীর কোন দোষে ডিভোর্স হলো! সেই ডিভোর্স পাওয়া বা দেওয়া মেয়েটির জ্ঞাতি গোষ্ঠী উদ্ধারও বাদ পড়ে না। আর তার যদি কোনো সন্তান থাকে, ছেলে হলে কোনো রকমে পাড় পেলেও মেয়ে হলে রক্ষা নেই! এই মেয়েকে কে বিয়ে করবে! বাবা নেই, কেউ মুখ তুলেও তাকাবে না! পড়াশোনায় খারাপ হলে তো কথাই নেই, ভালো হলে শুনতে হবে জজ ব্যারিস্টার হতে পারবে নাকি! বাবা তো থেকেও নেই, আর যদি সাকসেসফুল একটা ক্যারিয়ার হয়েও যায় তবু বিয়ে হবে না তথাকথিত ভালো ঘরে! যেন বিয়েটাই একটা মেয়ের জীবনের একমাত্র আরাধ্য আর লক্ষ্য! আমাদের সমাজে তো আবার সফলতা মানে জজ, ব্যারিস্টার, ডাক্তার অথবা বিসিএস ক্যাডার। যদিও আমার ভাবনাটাই একটু ভিন্ন। শুরুতেই ভিক্টিম ব্লেমিং কথাটা বলেছি কারণ এখানে ডিভোর্স ছাড়াও অন্যান্য ভিক্টিমের কথা উল্লেখ করেছি এবং ডিভোর্স হলে মেয়েদেরই ভিক্টিম ধরা হয়। সব ক্ষেত্রে কিন্তু সেটা না এবং আমার ক্ষেত্রেও প্রেক্ষাপট ভিন্ন।

এত কথা কেন বলছি? হ্যাঁ আমি ব্রোকেন ফ্যামিলি বিলং করি। আমার মা সিঙ্গেল মাদার হয়ে সমাজের সমস্ত নেতিবাচক দিক থেকে আমাকে আগলে রেখেছেন। নিজে বেঁচেছেন সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে। যে কথাগুলো ব্রোকেন ফ্যামিলি নিয়ে আমি লিখেছি তার প্রতিটাই আমাকে শুনতে হয়েছে, বরং আত্মীয় স্বজনদের কাছে বেশি। আমার মা কিংবা আমার অবশ্য এসবে কান দেওয়ার ফুসরত মেলেনি। কারণ মা’র নিজের কাছে উত্তরগুলো সব সময় পরিষ্কার ছিলো। নিজের ব্যক্তিত্ব, স্বত্ত্বাকে জলাঞ্জলি দিয়ে মিথ্যে সংসার নামক চার দেয়ালে আটকে থাকতে তিনি নিজেও পারেননি, আমাকেও শেখাননি কোনোদিন।

যা বলছি, আমার কিন্তু বিয়ে হয়েছে, তবে একদম কথা শুনতে হয়নি তা কিন্তু নয়। শ্বশুরবাড়ির না হলেও আত্মীয়ের আত্মীয়, শ্বশুরবাড়ির শুভাকাঙ্ক্ষীর অভাব ছিলো না খুব একটা। ওসব পরোয়া আমিই যখন করিনি, তারা আর সুবিধা করে উঠতে পারেননি খুব একটা। এবার কেউ কেউ বলবেন তো, আমি কেন কান দেইনি?

প্রথমত আমি তখন ছোট হলেও নেপথ্যের গল্প নিজের চোখে কিছুটা দেখেছি, দ্বিতীয়ত মা এবং পাঁচ মামা যেমন তুলোয় মোড়ানোর মত করে আগলে রেখেছেন তেমনি শিখিয়েছেন যুদ্ধ জীবনযুদ্ধ কী করে জয় করতে হয়। আইনে অনার্স, মাস্টার্স শেষ করে ভিক্টিমোলজিতে দ্বিতীয় মাস্টার্স করে নেশা এবং পেশা হিসেবে যখন লেখালিখি আর সাংবাদিকতাকে বেছে নেই, নানান ইতিবাচক কাজে নিজেকে তুলে ধরতে পারি তখন বোধহয় যাদের মনে রঙ বেরঙের প্রশ্ন ঘুরে বেড়াতো, তারা উত্তর পেয়ে গিয়েছেন। আর এরপরেও যারা রঙধনুর সাতরঙেও খুঁত খুঁজে বেড়ান তারা বরং নিজেরাই হাতরে খুঁজে নিক নিজেদের পছন্দের উত্তর। আমার এই সময় কই বলেন!

আমার গর্ব হয়, অহংকার নয়, যে আমি ব্রোকেন ফ্যামিলি বিলং করেও সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায়, আমার মায়ের অনুপ্রেরণা আর মামাদের যোগানো সাহস দিয়ে নিজের প্রচেষ্টায় এইটুকু অর্জন করতে পেরেছি। এইতো শুরু, সুস্থভাবে বেঁচে থাকলে আরও অনেক কিছু শেখার আছে, দেবার আছে পৃথিবীকে। মা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু আমার প্রতিটি রক্তবিন্দুতে মিশিয়ে দিয়ে গেছেন তার কিছু আদর্শ আর শিখিয়ে দিয়ে গেছেন সব প্রশ্নের উত্তর মুখে দিতে হয়না। আমি আমার এক বছরের মেয়েকেও শেখাতে চাই আমার মায়ের মতো হও, একজন ভালো এবং আদর্শ মানুষ হওয়াটাই জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।


লেখিকা,
এমি জান্নাত,
সাংবাদিক ও লেখক

এমি জান্নাত


Summary
Article Name
ব্রোকেন ফ্যামিলি
Description
ধর্ষিত হলে সে অপরাধী, খুন হলে সে অপরাধী, আর যদি সেটা কোনো মেয়ে হয় তো কথাই নেই...
Author
Publisher Name
THE POLICY TIMES
Publisher Logo